সেবাদানকারীর যত্ন কিভাবে নেবেনঃ পর্ব-২

take care of nursesগত পর্বে আমরা জেনেছি সেবা দানকারী ব্যক্তিটি কে এবং তার যত্নের কেন প্রয়োজন। আজকে এরই ধারাবাহিকতায় জানব যিনি নিজেই সেবা দান করছেন তার যত্নের জন্য বা সেবার জন্য আমাদের করণীয় কি এবং তা কিভাবে করব।

আমাদের সমাজের একটা প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে কোন ব্যক্তি যদি নিজের অধিকার বা প্রয়োজনটুকু চিন্তা করে তাহলে সে স্বার্থপরতা দেখাচ্ছে, শুধুমাত্র আরেকজনের জন্য ভাবতে হবে নিজের জন্য ভাবা ঠিক না ইত্যাদি ইত্যাদি। এ কারণে আমাদের পরিবারের যিনি সেবা দানকারী হয়ে থাকেন তিনি বেশিরভাগ সময়ই কিন্তু নিঃস্বার্থ মনোভাব বজায় রাখতে আরেকজনের জন্য নিবেদিত প্রাণ হন। সে কারণে সেবার বিষয়টি তিনি শুধু দিয়ে যাবেন কিন্তু নিতে পারবেন না এমনটাই বদ্ধমূল হয়ে থাকে।

আর এ কারণেই আপনি যখন সেবা দানকারীর যত্ন নেয়ার কথা বলবেন বা করতে যাবেন সেটি পরিবারের অন্যরা হয়ত ভাল ভাবে নাও নিতে পারে কিংবা সেবা দানকারী ব্যক্তিটি নিজেও হেসে উড়িয়ে দিতে পারে বা সংকোচ করতে পারে। তাই এই বিষয়টি যত সহজ মনে হচ্ছে অতটা সহজ নয়। একজন সেবা দানকারী ব্যক্তির যত্নে তাই আশেপাশের মানুষকে সচেতন হতে হবে। আসুন জেনে নেই সচেতন হয়ে আমরা কি করতে পারি।

  • সেবা দানকারী ব্যক্তিটিকে মাঝে মাঝেই ছুটি দিতে পারেন। তার অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে তাকে কিছুটা অব্যাহতি দিয়ে ঘুরতে যেতে বলতে পারেন। কিংবা বিশ্রাম নেয়ার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করে দিন। যেন তার নিজেকে দেয়ার মত সময়টা তিনি পান।
  • অসুস্থ যে ব্যক্তির সেবায় তিনি নিয়োজিত আছেন সেই ব্যক্তির সাথে রক্তের বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়ে থাকলে ঐ ব্যক্তির অসুস্থতা নিয়ে তার মনেও অনেক হতাশা, কষ্ট রয়েছে। তাই তার সেই না বলা কথা গুলো শুনতে হবে মনোযোগ দিয়ে।
  • অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে তার শরীরে যে পুষ্টির ঘাটতি হচ্ছে তা সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিকর খাদ্যের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • সেবা দানকারী ব্যক্তির স্বাভাবিক চাহিদা ব্যাহত হচ্ছে কিনা দেখতে হবে। যদি অসুস্থ ব্যক্তির সাথে তার এমন কোন বিষয় জড়িত থাকে যা সে মেটাতে পারছে না তাহলে সেটি কিভাবে সে অন্য কোন উপায়ে সমাধান করতে পারে বা মানিয়ে নিতে পারে সেটিও পরামর্শ বা সহযোগিতা করতে হবে।
  • অসুস্থ ব্যক্তির যদি কোন সংক্রামক রোগ থাকে তাহলে অবশ্যই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে অনেক সেবা দানকারী ব্যক্তিও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকেন। তাই একে সহযোগী বিবেচনায় এনে তাকেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতন রাখতে সহযোগিতা করতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা অনেক সংকোচ করি কারণ মনে করি যে অসুস্থ ব্যক্তিটি এত আপন অথচ তার অসুখে নিজেকে এত সচেতন রাখতে হবে কেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে ব্যক্তিটি আপনার আপন কিন্তু রোগটি নয়। সুতরাং অবশ্যই রোগীর প্রতি সম্পর্কের সবটুকু সম্মান বজায় রেখে আমাদের রোগ ও ব্যাধিগুলো নিয়ে সচেতন হতে হবে।
  • একটি পরিবারে কেউ অসুস্থ হয়ে থাকলে এর প্রভাব পুরো পরিবারেই পরে থাকে। তাই শুধুমাত্র সেবা দানকারী ব্যক্তিটিই নয় পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও নিজেদের প্রতি যত্নবান হতে হবে।

পরিবারে বসবাসকারী প্রতিটি ব্যক্তিই একে অন্যের অনেক বেশী আপন। আর তাই আপন মানুষটিকে যিনি সেবা দিচ্ছেন তার সুস্থতাও নিশ্চিত করা আমাদেরই দায়িত্ব। আসুন নিজের যত্ন নেই এবং সেবা দানকারীকেও যত্ন নিতে শিখি।

এই পর্বের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ুনঃ

 

প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল থাকতে Relaxation বা শরীর শিথীলকরণ: পর্ব-৫

Relaxation Techniques for Stress Relief Part 5

আমরা ধারাবাহিকভাবে শরীর শিথিলকরণের অনেকগুলো পদ্ধতি সম্পর্কে জেনেছি। আশা করছি আপনারা এটি প্রয়োগ করা শুরু করে দিয়েছেন এবং ভাল ফল ও পাচ্ছেন। আজকে শরীর শিথিলকরণের জন্য আমরা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি শিখব।

আমরা জানি যে আমাদের ছ’য়টি ইন্দ্রিয় রয়েছে। প্রতিটা ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রতি সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে প্রাকৃতিক বা পরিবেশগত তথ্য বা সিগন্যাল আমরা গ্রহণ করছি এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া করছি। যেমন চোখে দেখছি ও কাজ করছি। খাবারের ঘ্রাণ নেই আর ক্ষুধা অনুভব করি ইত্যাদি। আমরা জানি Relaxation এর মাধ্যমে এই ইন্দ্রিয়গুলো শিথিল হয় এবং শরীর ও শিথিলতা অর্জন করে। আসুন জেনে নেই Relaxation এর নতুন এই পদ্ধতিটি যা ইন্দ্রিয় সম্পর্কিত।

পদ্ধতি-৫ ( অনুভবে ইন্দ্রিয়)

  • একই ভাবে আরামদায়ক স্থানে বসতে হবে। যেখানে বসবেন তা যেন নিরিবিলি ও স্বস্তিকর হয়।
  • ধীরে ধীরে শ্বাস গ্রহণ করুন এবং ছাড়ুন। দুই থেকে চারবার লম্বা করে কিন্তু ধীরগতিতে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিন।
  • ধীরে ধীরে আপনার চোখ বন্ধ করুন। যারা চোখ বন্ধ করতে অসুবিধা হবে তারা চোখ খোলা রেখে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে তাকিয়ে থাকতে পারেন। (তবে চোখ বন্ধ রাখলেই এই পদ্ধতি বেশী কার্যকর হয়)।
  • আপনি যেহেতু চোখ বন্ধ করে নিচ্ছেন দর্শন ইন্দ্রিয়কে আমরা পুরোপুরি বিশ্রাম দিয়ে আমাদের অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোকে এবার একে একে মনোযোগ দিব। প্রথমে সমস্ত শরীরে কোথাও খুব শক্ত হয়ে আছে কিনা দেখুন। শরীরের কোন অংশ টাইট বা শক্ত হয়ে থাকলে সেটি শিথিল করে দিন।
  • যেখানে বসে আছেন সেই জায়গাটি স্পর্শ করুন। সেটি নরম নাকি শক্ত, কি উপাদানে তৈরি অনুভব করুন। যেখানে বসে আছেন সেখানে শীত নাকি গরম বা বায়ুর চাপ নাকি হালকা অনুভূতি হচ্ছে বুঝার চেষ্টা করুন।
  • স্পর্শ অনুভব বা ত্বক ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি নেওয়ার পর আমরা শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি নিব। বুঝার চেষ্টা করুন আশে পাশে কি কি শব্দ আপনার কানে আসছে। পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ, গাড়ির হর্ন, মানুষের কণ্ঠস্বর, হাঁটাচলার শব্দ বা যন্ত্রপাতির টুংটাং ইত্যাদি আলাদা করে শুনতে চেষ্টা করুন। শব্দগুলো কত দূর হতে আসছে সেটিও লক্ষ্য করুন।
  • এবার ঘ্রাণেন্দ্রিয় এর মাধ্যমে ঘ্রাণ নিন। নাকে কি কি ঘ্রাণ আসছে তা অনুভব করুন। এমন হতে পারে কোন ঘ্রাণ নাকে আসছে না এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। এমনটি হতেই পারে।
  • স্বাদ আর দর্শন ইন্দ্রিয় ছাড়া অন্য ইন্দ্রিয়ের অনুভব হয়ে গেলে সবগুলো ইন্দ্রিয়ের সমন্বয়ে এবার নিজেকে এবং নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করুন।
  • পরিবেশের সাথে আপনার ইন্দ্রিয়ের সংযোগ লক্ষ্য করুন।
  • সবশেষে নিজেকে ধন্যবাদ দিন এত চমৎকার ভাবে শরীর শিথিলকরণের পর্বটি সম্পন্ন করার জন্য। এরপর প্রক্রিয়াটি থেকে বের হয়ে আসুন।

এই পদ্ধতিতে দর্শন এবং স্বাদ ইন্দ্রিয় কে ব্যবহার করা হয়নি কারণ স্বাভাবিকভাবে আমাদের এই দুটি ইন্দ্রিয় বেশী কাজ করে থাকে এবং আমরা অন্য ইন্দ্রিয়গুলোর অস্তিত্ব খুব একটা অনুভব করি না কিংবা করতে চাই না। তাই এই পদ্ধতিতে বহুল ব্যবহৃত ইন্দ্রিয় দুটি বিশ্রামে থাকবে। আসা করি এই পদ্ধতিটিও আপনাকে প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল রাখবে কারণ ইন্দ্রিয়ের অফুরন্ত শক্তি আপনি সঞ্চয় করেছেন।

শরীর শিথিলকরণ সম্পর্কিত আরও লেখা পড়ুনঃ

১. প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল থাকতে Relaxation বা শরীর শিথীলকরণ: পর্ব-১
২. প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল থাকতে Relaxation বা শরীর শিথীলকরণ: পর্ব-২
৩. প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল থাকতে Relaxation বা শরীর শিথীলকরণ: পর্ব-৩
৪. প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল থাকতে Relaxation বা শরীর শিথিলকরণ: পর্ব-৪

হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠুন ৭ টি সহজ উপায়ে

On Fingers2
বেশিরভাগ মানুষই নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট নন। আর এ অসন্তুষ্টি থেকেই আসে হতাশা, নিজের উপর অভিমান কিংবা চাপা ক্ষোভ। অথচ পৃথিবীতে কেউই নিখুঁত নয়। আর প্রতিটি মানুষই তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদা। তাই জীবনকে সুন্দর ও আনন্দময় করে তুলতে চাইলে আজই নিজের বিষয়ে সব হতাশা ঝেড়ে ফেলুন, কাটিয়ে ফেলুন হীনমন্যতা। আজ থাকলো সেটারই কিছু দিক-নির্দেশণা।

(১) সুন্দর কোন কাজ করুন

যখনই আপনার খুব মন খারাপ হবে, নিজের ব্যাপারে হতাশ অনুভব করবেন, তখনোই হয়তো আপনি নিজেই নিজের সমালোচনা করতে শুরু করবেন। এটা আসলে নিজের আত্মবিশ্বাসকে অনেক কমিয়ে দেয়। এখন থেকে ভিন্ন কিছু করুন। যখনই মন খারাপ হবে, তখনোই এরকম কিছু মানুষের কথা বলুন যাদের আসলে আপনাকেই দরকার, আপনার সামান্য একটু সহযোগিতা হয়তো তাদের জীবন বদলে দিতে পারে। এরা হতে পারে আপনার পরিবার, বন্ধু কিংবা যে কেউ। আপনার একটি সুদর কাজ তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে। আর সেই হাসিটি কিন্তু আপনাকে মন খারাপ করে থাকতে দেবে না একদমই।

(২) নেতিবাচক চিন্তা বন্ধ করুন

নিজের ব্যপারে নেতিবাচক চিন্তা বন্ধ করুন এখন থেকেই। হয়তো আপনার কোন ত্রুটি কিংবা ভুল নিয়ে আশেপাশের মানুষ অনেক কথা বলবে। আপনার সে কথাগুলো গুরত্বের সাথে নেয়ার কোন প্রয়োজনই নেই, অথবা দরকার সেই সেইসব মানুষের সাথে তর্কে যাবার। নিজের ত্রুটি কিংবা ভুল কাজগুলো নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। কারণ, একটু খুঁজলেই দেখা যাবে, আপনার ভালো দিকের সংখ্যাও কম নয়! তাই মানুষের কথায় কান দিয়ে নিজের ব্যপারে নেতিবাচক চিন্তা করা বাদ দিন।

(৩) জীবনের লক্ষ্য স্থির করুন

জীবনের লক্ষ্য ঠিক করুন। হোক সেটা স্বল্প কিংবা দীর্ঘ মেয়াদের। আর এ লক্ষ্য হতে পারে যেকোন কিছু নিয়েই- ক্যারিয়ার, পড়াশোনা কিংবা কোন শখের কাজ। যখন আপনি লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোরভাবে পরিশ্রম করবেন, তখন আসলে আপনার মন খারাপ করার কিংবা নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগার কোন সুযোগই থাকবে না।

(৪) অনুপ্রেরণা গ্রহণ করুন

জীবনের ছোট ছোট বিষয় কিংবা আনন্দময় ঘটনাগুলো থেকে অনুপ্রেরণা নিন। প্রতিদিনের রুটিন জীবন মানুষের সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেয় ও মানুষকে করে তোলে হতাশ। আর এ অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে কারো একটু ভালো কথা, কারো আন্তরিকতাপূর্ণ হাসি, কোন দারুণ বই, সুন্দর একটি গান, মুভি কিংবা ভিডিও। আর নতুন কোন কিছুর শুরুটাই হয় অনুপ্রেরণা থেকে। যে জিনিস হয়তো শুধু আপনাকেই নয়, পালটে দিতে পারে আপনার গোটা পৃথিবীটাকেই।

(৫) নিজেকে অন্য কারো সাথে তুলনা করবেন না

কখনোই নিজেকে অন্য কারো সাথে তুলনা করবেন না। সবাই যার যার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র। নিজের ভালো দিক, নিজের দক্ষতা নিয়ে সচেতন হন- যা হয়তো অন্য কারো নেই। আর অবশ্যই সব সময়ই নিজেকে আরো উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করুন।

(৬) নেতিবাচক মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকুন

যারা সব সময় অন্যের দোষ ধরে বেড়ায় তাদের কাছ থেকে দূরে থাকুন। তারা নিজেরা হতাশ, আর সেই হতাশাকে অন্যের মাঝেও ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। হয়তো এ ধরণের মানুষগুলো আপনার খুব কাছের কেউ হতে পারে, তবুও আবেগকে সংযত করে এগিয়ে যান নিজের আলোকময় পথে।

(৭) পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও শরীরের যত্ন নিন

জীবনে ভালো থাকার জন্য দেহ ও মন- দুটোরই পর্যাপ্ত যত্ন নেয়া দরকার। প্রতিদিনের কাজের চাপ ও এতো এতো চিন্তার মাঝে ভালো থাকাটাই তো দায়! তবুও চেষ্টা করুন শরীরের যত্ন নিতে ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে। এতে ক্লান্তি আর হতাশা আপনাকে গ্রাস করতে পারবে না।