চিন্তা যখন দুশ্চিন্তা নিয়ে, কি হবে আপনার করণীয়?

Tensed With Anxiety

Tensed With Anxietyএকটু ভালো করে ভেবে দেখলে আমরা বুঝতে পারবো যে আমাদের সকল শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মূলে রয়েছে দুশ্চিন্তা নামক ঘুণপোকার প্রত্যক্ষ অবদান। চিন্তা যখন দুশ্চিন্তা করা নিয়ে তখন এর জন্য সঠিক সমাধাণ বের করাটা সত্যি বেশ কষ্টকর। কারণ আমাদের কাছে এমন কোন জাদুকরী কিছু নেই যার ছোঁয়ায় আমরা মুহূর্তেই সকল দুশ্চিন্তা মন থেকে গায়েব করে দিতে পারবো।

দুশ্চিন্তা (Anxiety) এমন একটি অনুভূতি যেটা মানুষ না করতে চাইলেও আপনা আপনি মাথায় চলে আসে। তাই বলে ব্যাপারটা এমন নয় যে দুশ্চিন্তা থেকে আমরা কোনভাবেই নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবোনা। সামান্য কিছু কৌশল জানা থাকলেই দুশ্চিন্তা নামক এই ব্যাধি থেকে আমরা নিজেদের দূরে রাখতে পারি।

আসুন আপনার দুশ্চিন্তা করা নিয়ে চিন্তার সমাধানে কিছু পরামর্শ দেওয়া যাক 🙂

  • যখন দুশ্চিন্তা আপনাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে ফেলে একবার নিজে শান্ত হয়ে বসে ভাবুন আপনার দুশ্চিন্তা মূলত কি নিয়ে। একবার যদি দুশ্চিন্তার জুতসই কোন কারণ খুঁজে বের করতে সক্ষম হন তাহলে দেখবেন দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে আসবে।
  • খুব বেশী দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হলে ভাবুন যে দুশ্চিন্তা করার ফলে আপনি কি কোন সমাধানে আসতে পারছেন? নাকি আপনার দুশ্চিন্তা করার এই অভ্যাসের কারণে নিজে আরও বেশী হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন? মনে রাখুন দুশ্চিন্তা করা কোন সমস্যার সমাধান নয়। এটা মেনে নিন দেখবেন দুশ্চিন্তা আপনাকে আগ্রাসন করতে পারবে না।
  • দুশ্চিন্তা করার আরেকটি অর্থ হল নিজের সময় অপচয় করা। আপনি আপনার জীবনের সমগ্র সময় থেকে যে সময়গুলো শুধুমাত্র দুশ্চিন্তা করে কাটিয়েছেন সেই সময়গুলো কেবল অপচয় হয়েছে মাত্র। এই কথাটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে শিখুন। আপনার এই বিশ্বাস আপনাকে দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করবে।
  • দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মানুষেরা নিজেদের একা রাখতে পছন্দ করে। যেটা সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত। আপনি যদি কোন ব্যাপারে দুশ্চিন্তার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে সেটা নিজের মধ্যে চেপে না রেখে আপনার বিশ্বস্ত মানুষের সাথে আলোচনা করুন। দেখবেন আপনার দুশ্চিন্তা অনেকটা কমে যাবে।
  • যে ব্যাপারটা আপনাকে বার বার দুশ্চিন্তা করতে বাধ্য করবে সেটা আপাতত এড়িয়ে যেতে নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখুন। এক কথায় আপনার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিন। মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ফলে একটা সময় আপনার দুশ্চিন্তার কারণ তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে।
  • যেকোন মানসিক অস্থিরতা (emotional instability) থেকে নিজেকে দূরে রাখতে মেডিটেশন (meditation) এর তুলনা হয়না। যখনই আপনি নিজেকে দুশ্চিন্তার কবলে পড়তে দেখবেন আপনি নিজেকে মেডিটেশনের জন্য প্রস্তুত করতে থাকুন। প্রায় নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যাই যে মেডিটেশন আপনাকে সকল চিন্তা বা দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা করবে।
  • শারীরিক কসরত (physical exercise) করার মাধ্যমেও দুশ্চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়। আপনার মন দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হয়ে উঠলে সামান্য কিছু ব্যায়াম করুন। দেখবেন দুশ্চিন্তা হতাশা গ্লানি সবটা কেমন কমে আসছে।
  • পরিবারের মানুষগুলোর সাথে কিছু ভালো মুহূর্ত কাটাতে পারেন। আপনার সঙ্গীকে নিয়ে কিছু একান্ত সময় উপভোগ করতে পারেন অথবা পরিবারের ছোট সদস্যদের সাথে মেতে উঠতে পারেন হাঁসি আনন্দে। উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা কমাতে এগুলোর বিকল্প হয়না।
  • দুশ্চিন্তা কমাতে আপনার দুচোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিন আর শ্বাস ছাড়ুন। এতে করে আপনার শরীরে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে যাবে আর আপনার স্নায়ু শান্ত হয়ে আসবে এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আপনার মাংসপেশি শিথিল হয়ে আপনার দুশ্চিন্তাগ্রস্থতা কমে যাবে।

কাজ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা দূর করুন আজ থেকেই

Ways to Eliminate Stress At Work
কাজ করার আগে তো আমাদের একটা স্ট্রেস থাকেই। এটাকে বলে স্বাভাবিক স্ট্রেস। যা কাজকে গতি দেয়। তবে যদি সেটা অতিরিক্ত হয়ে যায় অবশ্যই স্ট্রেস থেকে আপনাকে বের হয়ে আসতে চেষ্টা করতে হবে। কাজের আগের দুশ্চিন্তা নয় বরং যারা কাজটা শেষ করার পরেও দুশ্চিন্তা মুক্ত হতে পারেন না আজকের লেখাটি তাদের জন্যই।

এমন অনেকেই আছেন যারা কাজ হওয়ার পর ’কেমন হল, সবাই কি ভাবল, এমন না হয়ে তেমন হতে পারত, ইস্ আরেকটু এমন হত, নাহ ঠিক হল না’ ইত্যাদি ভেবে ভেবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এই চিন্তাগুলো আমাদের ঐ শেষ হওয়া কাজের কোন উপকারেই আসে না বরং আমরা মানসিকভাবে অতিরিক্ত চাপ অনুভব করা শুরু করি যা অনেকসময়ই অন্য কাজে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।

আসুন জেনে নেই কাজ শেষ হওয়ার পর কি কি করলে এই অতিরিক্ত চিন্তাটা আমাদের আর দুশ্চিন্তা হয়ে যন্ত্রণা দিবে না।

১. কাজ শুরুর আগে তালিকা তৈরি করুন (make a plan before start)

সপ্তাহ বা দিন বা মাস হিসেবে কাজের তালিকা বা কর্মপরিকল্পনা করুন। এটা আপনাকে কাজ নিয়ে এলোমেলো বা অহেতুক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রাখবে।

২. কাজ শেষে নিজের গঠনমূলক সমালোচনা করুন (criticize yourself )

গঠনমূলক সমালোচনা কিভাবে করতে হয় সেটা জানতে হবে। প্রত্যেকটা কাজের ভাল-মন্দ দুটি দিক আছে। তাই খারাপ দিক থাকলে যেমন নিজেকে শুধরে নিবেন একই ভাবে ভাল দিকটির জন্য নিজেকে প্রশংসা করুন। শুধুমাত্র নেতিবাচক বা ইতিবাচক না ভেবে দুটো দিক নিয়েই ভাবুন। ভাবনা শেষে নিজেকে ধন্যবাদ জানান কারণ গঠনমূলক সমালোচনা সঠিকভাবে খুব কম মানুষই করতে পারে।

৩. যে কাজটি শেষ করেছেন সেটার ফলোআপ নিন (follow up the works you have done)

আমরা কাজ করে এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাই না। এটা নিজের একটি চরম দুর্বল দিক। এতে করে যেটা হয় যে যারা কাজ অবহেলা করি তারা সবসময় অবহেলা করতেই থাকি আর যারা এটাকে সংশোধনের বা নতুন কিছু সংযোজনার চিন্তা করি তারা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে যাই। সুতরাং কাজটির যদি নিয়মিত ফলোআপ নিতে পারেন সেটি আপনাকে বাড়তি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিবে।

৪. কর্মতালিকার অন্যান্য কাজের দিকে নজর দিন (focus on the task list)

মনে করে দেখুন কাজ শুরুর পূর্বে আপনার একটি তালিকায় আরও কাজ ছিল। এবার সেগুলো নিয়ে কাজ শুরুর পালা। আর সব শেষ কাজটি হয়ে গেলে যে নতুন কাজের পরিকল্পনা করতে হবে।

৫. কাজের পাশাপাশি নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন (regular light exercise)

কাজ এর পাশাপাশি হালকা ব্যায়াম, হাটা চলা করুন। মুক্ত বাতাসে কিছুক্ষণ সময় কাটান। বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিন।

৬. কাজের ফাঁকে করুন একটু বিনোদন (entertain yourself)

একটি কাজ শেষ করেই অন্য কাজ শুরু করার আগে হয়ে যাক খানিক বিনোদন। একটু গলা ছেড়ে গান গাইতে পারেন কিংবা হেডফোনে গান শুনে খানিক নাচতে পারেন। এটি শুনতে হাস্যকর মনে হলেও এই বিনোদন আপনাকে দিবে নতুন করে কাজ করার প্রাণোদ্যম।

৭. ধূমপান পরিহার করুন (quit smoking)

আমাদের একটা ভুল ধারণা তামাক বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছে যে কাজের দুশ্চিন্তায় ধূমপান আপনাকে সহযোগিতা করবে। এটা মারাত্মক একটি ভুল তথ্য বা ধারণা। বরং এই ধূমপানের ফলে আপনার মস্তিষ্কের উর্বর কোষগুলো হয়ে যাবে রুগ্ন এবং কাজ শেষে উদ্বিগ্নতা বৃদ্ধির এটি প্রধানতম কারণ।

তাহলে আসুন নিজেকে সহযোগিতা করতে আমরা একটু সচেতন হয়ে এই কার্যকরী পদক্ষেপ নিই এবং মুক্ত থাকি কাজ শেষে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থেকে।

এ ধরণের আরও লেখা পড়ুনঃ

কিভাবে আপনার অনিদ্রার সমস্যা সমাধান করবেন?

Sleeping man

বর্তমান সময়ে অনিদ্রাতে ভুগছে এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষ কি করলে অনিদ্রার সমস্যা দূর করা যায় তা জানেনা যার ফলে অনেকে বছরের পর বছর অনিদ্রা সমস্যা নিয়ে জীবন যাপন করে এছাড়াও অনেকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে কিন্তু এই পদ্ধতি শরীরের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি মূল সমস্যাও এর দ্বারা দীর্ঘস্থায়ী ভাবে সমাধান করা যায়না।

এছাড়াও দীর্ঘদিন এই ধরনের ওষুধ খেলে ওষুধের উপর নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। আসুন জেনে নেয়া যাক কিভাবে অনিদ্রার সমস্যা কোন প্রকার ওষুধ ছাড়া সমাধান করবেন।

  • প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন – ছুটির দিন হোক কিংবা অন্য কোনও দিন হোক ঘুম থেকে উঠার সময় প্রতিদিনই একই রাখুন । যেদিন শরীরের বিশ্রাম বেশী প্রয়োজন হবে সেদিন ঘুম আগে আগেই এসে পড়বে আর যেদিন ঘুম কম প্রয়োজন হবে সেদিন তুলনামুলক দেরিতে ঘুম আসবে। প্রতিদিন এভাবে ঘুমালে শরীর আস্তে আস্তে এই নিয়মের সাথে মানিয়ে নিবে।
  • প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট ব্যায়াম করুন – প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট এমন কিছু ব্যায়াম করুন যা করলে দ্রুত ঘাম ঝরে বা দ্রুত ক্লান্তি আসে। তবে অবশ্যই সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে ব্যায়াম করতে হবে কারণ সন্ধ্যার পর ব্যায়াম করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
  • প্রাকৃতিক শব্দ শুনুন – পানির শব্দ , বৃষ্টির শব্দ , সমুদ্রের স্রোত , বাতাসের শব্দ ইত্যাদি ঘুমানোর সময় হেড ফোনে বা স্পিকারে ছেড়ে শুনুন । মানসিক চাপ কমানোর জন্য এবং রিলাক্সড বা মানসিকভাবে স্থির হবার জন্য খুবই ভালো পদ্ধতি এটি । মানসিক চাপ মুক্ত সুস্থির মন ঘুমের জন্য
    প্রয়োজন ।
  • গভীর নিঃশ্বাস এর ব্যায়াম করুন – ঘুমানোর সময় গভীর নিঃশ্বাস এর ব্যায়াম করলে শরীর এবং মন রিলাক্স হয়, এতে শরীর এবং মন ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয় । এজন্য বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন এবং মনে মনে আস্তে আস্তে ১ থেকে ৭ পর্যন্ত গণনা করতে করতে গভীর ভাবে নিঃশ্বাস নিন এবার ৪-৫ সেকেন্ড নিঃশ্বাস আটকে রাখুন এবার মনে মনে আস্তে আস্তে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত গণনা করতে করতে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ুন । এরপর শরীরকে মনে মনে বলুন শিথিল হয়ে যেতে এবং শরীর কে যথাসম্ভব ঢিলা বা শিথিল করে দিন। এভাবে এই পুরো প্রক্রিয়া ৫-১০ বার করুন।

আশা করছি আপনারা এই পদ্ধতি গুলো ভালো ভাবে অনুসরণ করবেন এবং উপকৃত হবেন । পরবর্তী পর্ব লিখার পূর্ব পর্যন্ত আপনারা ভালো থাকবেন এই প্রত্যাশায় আজকের মত বিদায়।

আরো পড়ুন

পরামর্শ.কম এ স্বাস্থ্য ও রূপচর্চা বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলো সংশ্লিষ্ট লেখকের ব্যক্তিগত মতামত ও সাধারণ তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত। তাই এসব লেখাকে সরাসরি চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য অথবা রূপচর্চা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। স্বাস্থ্য/ রূপচর্চা সংক্রান্ত যেকোন তথ্য কিংবা চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের/বিউটিশিয়ানের শরণাপন্ন হোন।

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করছি। পরামর্শ.কম এর অন্যান্য প্রকাশনার আপডেট পেতে যোগ দিন ফেইসবুক, টুইটার, গুগল প্লাসে অথবা নিবন্ধন করুন ইমেইলে।