নিয়ন্ত্রণ করুন নিজের রাগ ও এর বহিঃপ্রকাশের ধরণ

coltrol anger

আমাদের অন্যান্য অনুভূতিগুলোর মতই রাগ অনেক স্বাভাবিক এবং শক্তিশালী একটি অনুভূতি। তবে অতিরিক্ত রাগ ও এর অনিয়ন্ত্রিত বহিঃপ্রকাশ নিজের জন্যে এবং অন্যজনের জন্যেও ক্ষতিকর। রাগ হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের মধ্যে কিছু শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তন হয়ে থাকে। আমরা যদি জানতে পারি আমাদের পরিবর্তনগুলো কিভাবে হচ্ছে এবং ক্ষতিকর দিকগুলো কি তাহলে সহজ হয়ে যাবে জীবন-যাপনের জটিলতা।

রাগে একজন ব্যক্তির শারীরিক পরিবর্তনঃ

  • ঘাম হয়, শরীর কাঁপতে থাকে
  • হৃৎপিণ্ডে দ্রুত রক্ত চলাচল ঘটে
  • মাথা ভার হয়ে যায়
  • দ্রুত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ঘটে
  • অতিরিক্ত রাগে কখনও কখনও হার্ট-এট্যাক, ব্রেইন-স্ট্রোক হতে পারে।

রাগে ব্যক্তির মানসিক পরিবর্তনঃ

  • নিজের ও অন্যদের উপর বিরক্তি তৈরি হয়
  • সম্পর্ক ও বিশ্বাস বিনষ্ট হয়
  • আত্ম-সম্মানবোধ কমে যায়
  • আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হয়

রাগে ব্যক্তির আচরণগত পরিবর্তনঃ

  • আক্রমণাত্মক অঙ্গভঙ্গি প্রকাশ পায়( যেমন- আঙ্গুল তুলে কথা বলা, আঘাত করা)
  • কণ্ঠস্বর তীব্র ও কর্কশ হয়ে যায়
  • কাজ-কর্মে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হয়
  • নিজেকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে ( হাত কাটা, মাদক গ্রহণ, আত্মহত্যা)
  • অন্যদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে (মারধোর করা, ভয় ভীতি দেখানো, ত্রাস সৃষ্টি করা)
  • ভাংচুর করে পরিবেশ নষ্ট করে
  • আইন নিজের হাতে তুলে নেয়

এমনটা হলে আমাদের জানতে হবে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো অভ্যন্তরীণ ভাবে হতে থাকে। এবং আচরণগত পরিবর্তনটা আমরা নিজেরা করে থাকি। তাই রাগ প্রকাশ করার আচরণ কি হবে সেটা আমাদের নিজেদের নির্ধারণ করতে হবে। এখানে সংক্ষিপ্ত কিছু কৌশল দেয়া হল এর বাইরেও অনেক কৌশল রয়েছে যা ব্যক্তিকে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে থাকে।

রাগ বহিঃপ্রকাশে আচরণ নিয়ন্ত্রণের কৌশলঃ

    ১. নিজের রাগ কখন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে হচ্ছে সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা রাখা।

    ২. রাগ এর পরিমাণ সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। যখন রাগ করছি তখন কতটা রেগে যাচ্ছি সেটাকে একটা নম্বর দেয়া।

    ৩. রাগ হওয়ার সময় সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া না করে কিছুক্ষণ বিরতি নেয়া। ২ থেকে ৩ মিনিট সময় নেয়া যেতে পারে। কিংবা রাগের মাত্রার উপর নির্ভর করে আরও সময় বাড়ানো কমানো যায়। আমি কিভাবে রাগ প্রকাশ করছি এবং এতে আশেপাশে কেউ বা নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি কিনা বিশ্লেষণ করা। যদি এমন আচরণ শনাক্ত করা যায় তাহলে এর পরিবর্তে অন্য কোন আচরণটা যুক্তিসঙ্গত ভাবে আমার রাগ প্রকাশ করবে এবং অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না সেটা বাছাই করা। ( যেমন কেউ কেউ ঐ স্থান থেকে সরে গিয়ে নিরিবিলি বসে থাকে, অন্য কোন কাজে মনোযোগ দেয়, পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলে, রাগ হওয়ার কারণটা স্পষ্ট করে বলে ইত্যাদি)।

    ৪. নিজে থেকেই রাগের মুহূর্তের বাছাইকৃত আচরণটাকে অনুশীলন করা এবং স্বেচ্ছায় পরিবর্তিত আচরণটা করার প্রত্যয় গ্রহণ করা।

    ৫. যখন কোন ক্ষেত্রে দেখলেন পরিবর্তিত আচরণ করতে পেরেছেন তখন নিজেকে মনে মনে প্রশংসা করা।

রাগের মুহূর্তে অন্যদের কিছু কাজ আমাদের আরও রাগিয়ে দেয়। সে সময়ে মনে রাখতে হবে, রাগ যেহেতু স্বাভাবিক অনুভূতি তাই একজন মানুষ হিসেবে আমরা তো রাগ করবই। কিন্তু রাগ প্রকাশ করার আচরণ এর উপর আমাদের নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সুতরাং আমরা একটু সচেতন হলেই এই আচরণ ইতিবাচক ভাবে বদলে ফেলতে পারি।

এ ধরণের আরও লেখা পড়ুনঃ

আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উপায়

increase self controlকখনো কি এমন হয়েছে আপনি অনেক রেগে গেছেন এবং শেষ পর্যন্ত রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন? কখনো কি এমন হয়েছে আপনি স্কুলের পরীক্ষায় খারাপ করেছেন কারণ পড়াশুনার চেয়ে খেলাধুলা তখন আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সংকেতগুলো হলো আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম বা নিজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না।

আত্মনিয়ন্ত্রণ হলো দৈনন্দিন জীবনে আপনার যে কাজ এবং সিদ্ধান্ত নেন তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। একজন আত্মনিয়ন্ত্রক ব্যাক্তির খুব শান্তভাবে লোভ ও মনের বিক্ষিপ্ত অবস্থা নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা থাকে এবং সেখানে অটল থাকে। নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি বা ক্ষমতা না থাকলে  আপনি বিষণ্ণ, অক্ষম ও দুর্বল অনুভব করতে পারেন। কিন্তু চিন্তার বিষয় নেই। আপনি আপনার জীবন পরিবর্তন করতে পারেন। কিছু সহজ পদক্ষেপ অনুসরণ করে আপনি আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখতে পারেন।

১. প্রথমেই চিহ্নিত করুন আপনার জীবনে চলার পথে কোন কোন বিষয়ে অধিক আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কোথায় আপনি আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব অনুভব করছেন? যেমনঃ খাওয়া-দাওয়া, কেনাকাটায়, কাজেকর্মে, ধূমপানে বা বার বার একই আচরণে।
২. চিহ্নিত করুন সেই অনুভূতিগুলো যেগুলো আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। যেমনঃ রাগ, অসন্তুষ্টি, অখুশি, বিরক্তিবোধ, আনন্দ অথবা ভয়।
৩. সেসব চিন্তা ও বিশ্বাসগুলোকে চিহ্নিত করুন যা কিনা আপনাকে অনিয়ন্ত্রিত আচরণের দিকে ঠেলে দেয়।
৪. দিনে কিছু সময় বিশেষ করে যখন আত্মনিয়ন্ত্রণের  প্রয়োজন তখন নিজেকে নিজেই বোঝাতে পারেন-

  • আমি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত
  • আমার অনুভূতি ও চিন্তা পছন্দের জন্য আমার শক্তি আছে
  • আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আমাকে শক্তি দেয় এবং সফল হতে সাহায্য করে
  • আমার প্রতিক্রিয়ার প্রতি আমার নিয়ন্ত্রণ আছে
  • আমি আমার আচরণ পরিবর্তন করতে পারি
  • দিন দিন আমার অনুভূতি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ছে
  • আত্মনিয়ন্ত্রণ আনন্দের এবং মজার

নিজেকে পুরস্কৃত করুন যেমন ঘুরতে যাওয়া,মুভি দেখা,বা নিজেকে কিছু দেয়া। পুরস্কার সত্যিই আত্মনিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। বাস্তবতা ও নিজের প্রত্যাশার সাথে মানিয়ে নিন। আশাবাদী হোন।

আত্মনিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি। বার বার একই চিন্তা, ভয়, আসক্তি এবং নিজে নিজের প্রতি ভুল আচরণ থেকে বের হওয়ার জন্য। এটি আপনাকে আপনার জীবন, আচরণ ও প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। এটা আপনার সম্পর্ক, ধৈর্য ও সহ্য ক্ষমতা তৈরিতে উন্নত করবে এবং আপনার সুখী রাখবে।
আরো পড়ুন
নিজের উপর আস্থা ফিরিয়ে আনুন, বাড়িয়ে তুলুন আত্মমর্যাদাবোধ
লেখাটি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করছি। পরামর্শ.কম এর অন্যান্য প্রকাশনার আপডেট পেতে যোগ দিন ফেইসবুক, টুইটার, গুগল প্লাসে অথবা নিবন্ধন করুন ইমেইলে।