মুভি রিভিউ- X Men সিরিজ: অ্যাডভেঞ্চার, সাই-ফাই, অ্যাকশন আর ফ্যান্টাসি

x-menসৃষ্টির শুরুতে মানুষ কি এখনকার মত ছিল ? এখনকার মত গড়ে সাডে পাঁচ ফিট লম্বা, দুই হাত-দুই পা-দুই চোখ-এক মাথাওয়ালা ? চালর্স ডারউইনের বিবর্তনবাদ বলে- এক সময়ে মানুষ অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষরা চার পায়ে হাঁটত। ধীরে ধীরে তারা দাঁড়াতে শিখেছে, বেঁচে থাকার তাগিদে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি আর ঘ্রাণশক্তির অধিকারী হয়েছে, কথা বলা শিখেছে, আস্তে আস্তে সভ্য হয়েছে। কিন্তু বিবর্তন কি থেমে গেছে ?

বিজ্ঞানীদের মতে বিবর্তন একটি ক্রম চলমান প্রক্রিয়া। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি প্রজাতি আরো শক্তিশালী হয় কিংবা বিলুপ্ত হয়ে নতুন কোন প্রজাতির সৃষ্টি হয়। মূলত বিজ্ঞানীদের এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই এক্স ম্যান সিরিজটি তৈরি হয়েছে। এখানে দেখানো হয়েছে- কিছু মানুষের ডিএনএ পরিবর্তিত হয়ে তারা অদ্ভুত কিছু শক্তি লাভ করেছে। সাধারণ মানুষ তাদের নাম দিয়েছে- মিউটেন্ট। মিউটেন্ট আর সাধারণ মানুষের ক্রম চলমান দ্বন্ধ সংঘাতই এক্স-ম্যান সিরিজটির মূল উপজীব্য। অ্যাকশন, ফ্যান্টাসি, সায়েন্স ফিকশন এই তিন ঘরানার মিশেল সিরিজটির প্রথম মুভিটি মুক্তি পায় ২০০০ সালে আর সপ্তমটি এই বছরই, ২০১৪তে। সিরিজটি প্রযোজনা করেছে Marvel Enterprises আর ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে ছিল 20th Century Fox।

X-Men

এক্স ম্যান সিরিজের প্রথম মুভি X Men মুক্তি পায় ১৪ জুলাই, ২০০০ সালে। ১০৪ মিনিট দৈর্ঘের এই ছবিটির পরিচালক ছিলেন ব্রায়ান সিঙ্গার। মুভিটি সিরিজের প্রথম ছবি হলেও এতে কিছু পূর্বকাহিনী বাকি থেকে যায়। ট্রিলজি ভিত্তিক মুভিগুলোর মাঝে এমন স্টার্টিং ব্যতিক্রম। পরিচালক এক্ষেত্রে যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন বলা যায়। মুভিটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে লোগান (Hugh Jackman) নামের স্মৃতিহারা এক চিরতরুণ যার হাত মুষ্টিবদ্ধ করলেই তলোয়ার বেরিয়ে আসে, রোক (Anna Paquin) নামের এক অভাগা তরুণী যে কাউকে স্পর্শ করলেই সে মৃত্যু-দুয়ারে পৌঁছে যায়, চার্লস জ্যাবিয়ার (Patrick Stewart) নামের একজন প্রফেসর যে মানুষের ভাবনা পড়তে পারে, ম্যাগনিটো (Ian McKellen) নামের এক ভয়ানক ভিলেন যে ধাতু নির্মিত যেকোন কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, মিস্তিক (Rebecca Romijn) ম্যাগনিটোর সর্বক্ষণিক সহযোগী যে কারো রূপ ধারণ করতে পারে, যে কারো স্বর নকল করতে পারে। আরো আছে জ্বিন (Famke Janssen) যে ধীরে ধীরে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা শিখছে, স্কট (James Marsden) যে চোখের আগুনে সব ভস্ম করে দিতে পারে আর স্ট্রম (Halle Berry) যে মূহুর্তেই আবহাওয়া বদলে দিয়ে ঝড় তুলতে পারে। লোগান আর রোককে আক্রমণ করে বসে ম্যাগনিটোর লোকজন, উদ্দেশ্য রোককে ছিনিয়ে নেয়া। সেখান থেকে স্ট্রম আর স্কট তাদের উদ্ধার করে। কিন্তু ম্যাগনিটো রোককে পেতে মরিয়া, অবশেষে সে সফলও হয়। তার উদ্দেশ্য ভয়ংকর, রোকের শক্তি ব্যবহার করে মিউটেন্ট ডিএনএ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। এদিকে এক্স-ম্যানরা তাকে রুখতে মরিয়া। শুরু হল লোগান, জ্বিন, স্কট আর স্ট্রমের ভয়ংকর মিশন। তারা কি পারবে মানব জাতিকে বাঁচাতে ? মুভিটির IMDb রেটিং ৭.৪/১০।

X2 (X-Men United)

এক্স ম্যান সিরিজের দ্বিতীয় মুভি X2। ১৩৪ মিনিটের এই মুভিটি মুক্তি পায় ২ মে, ২০০৩।ব্রায়ান সিঙ্গার পরিচালিত এই মুভির প্রথমে দেখা যায় ক্রুট ওয়াগনার (Alan Cumming) নামের এক মিউটেন্ট ইউএস প্রেসিডেন্টকে আক্রমণ করে বসে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে কর্ণেল উইলিয়াম স্টাইকার (Brian Cox) মিউটেন্টদের স্কুল আক্রমণ করে, সেখানকার বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যায়। এদিকে মিস্তিক ম্যাগনিটোকে উদ্ধার করতে গিয়ে স্টাইকারের এক ভয়াবহ পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। স্টাইকার একটা দ্বিতীয় সেরিব্রো তৈরি করে যেটা দিয়ে দুনিয়ার সকল মিউটেন্টকে এক সাথে মেরে ফেলা যাবে। এই সেরিব্রো চালানোর জন্য তার দরকার প্রফেসর জ্যাবিয়ারকে। বন্ধু ম্যাগনিটোর সাথে দেখা করতে গিয়ে স্টাইকারের হাতে আটক হন জ্যাবিয়ার। মিস্তিকের বুদ্ধিতে ম্যাগনিটো মুক্ত হয় ঠিকই, কিন্তু প্রফেসর ওদের হাতে বন্দি থাকায় দুনিয়ার সকল মিউটেন্টের জীবন হুমকির মুখে পড়ে যায়। এক্স ম্যানরা কি পারবে তাদের সবাইকে বাঁচাতে ? মুভিটির IMDb রেটিং ৭.৫/১০।

X-Men: The Last Stand

২০০৬ সালে মুক্তি পায় এক্স ম্যান সিরিজের তৃতীয় মুভি X Men: The Last Stand. ১০৪ মিনিট দৈর্ঘের এই মুভিটি পরিচালনা করেন ব্রিট রাটনার। জিমি, ছোট্ট একটা বাচ্চা। তার আরেকটা পরিচয় সে একজন মিউটেন্ট এবং তার ক্ষমতা হচ্ছে তার সংস্পর্শে অন্য কোন মিউটেন্টের শক্তি কাজ করে না। জিমির ডিএনএ দিয়ে একটা কিউর তৈরি করা হয়, মিউটেন্টরা চাইলে এই কিউর ব্যবহার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে। জিমিকে মারার জন্য উঠে পড়ে লাগে ম্যাগনিটো, এবার তার সঙ্গ দিচ্ছে আরো ভংকর কিছু মিউটেন্ট। এদিকে জিনকে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয় স্কট। জ্বিন ফিরে আসে, কিন্তু তার ভেতর জন্ম নেয় নতুন একটা সত্ত্বা, যে সত্ত্বার সাথে এক্স ম্যানরা পরিচিত নয়। আগের দুইটি মুভিতে এক্স ম্যানদের হয়ে কাজ করা জ্বিন এবার ম্যাগনিটোর দলে। এক্স ম্যানরা কি পারবে জ্বিনের ধ্বংসলীলা থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে ? IMDb তে মুভিটির রেটিং ৬.৮/১০।

X-Men Origins: Wolverine

এক্স ম্যান সিরিজের চতুর্থ মুভি X Men Origins: Wolverine পরিচালনা করেন গেভিন হুড। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া ১০৪ মিনিটের এই মুভিতে লোগানের কাহিনী দেখানো হয়েছে। X Men-এ লোগানকে পাওয়া গিয়েছিল স্মৃতিভ্রষ্ট অবস্থায়। ১৫ বছর ধরে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিল সে। এই মুভিতে তার গল্প বলা হয়, তার স্মৃতি হারানোর পেছনের কাহিনী দেখানো হয়। কর্ণেল উইলিয়াম স্টাইকারের (Danny Huston) সাথে তার শত্রুতা, তার শরীরে সেই ভয়াবহ অপারেশানের মাধ্যমে বসানো উত্তপ্ত ধাতু বসানো, তার ভাই ভিক্টর ক্রেডের (Liev Schreiber) সাথে তার শত্রুতার শুরু, তার স্ত্রী কায়লা সিলভারফক্সের (Lynn Collins) মৃত্যু এবং সবশেষে তার স্মৃতি হারানোর কাহিনী দেখানো হয়। IMDb তে মুভিটির রেটিং ৬.৮/১০।

X-Men: First Class

এক্স ম্যান সিরিজটা শুরু হয়েছিল একটি অসমাপ্ত কাহিনী থেকে। প্রথম মুভি X Men এ অনেক কিছু দেখানো হয়নি। এখানে সেই ব্যাপারগুলো দেখানো হয়। চার্লস আর এরিক তখন বন্ধু ছিল, তাদের সাথে ছিল এক অসাধারণ তরুণ বিজ্ঞানী হ্যাঙ্ক, যে সেরিব্রো তৈরি করে। এই মুভিতে কিছুটা ইতিহাসও ঢুকানো হয়। ১৯৬২ সাল, আমেরিকা আর রাশিয়ার মধ্যে তখন টান টান উত্তেজনা, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আবশ্যম্ভাবী- ঠিক সেই সময়ের কাহিনী। তখন এক্স ম্যানদের প্রথম টিম টা গঠিত হয়। তারপর টিম ভেঙ্গে এরিক কিভাবে ম্যাগনিটো হল, চালর্সের বোন রেভেন মিস্তিক নাম নিয়ে কেন ম্যাগনিটোর সাথে যোগ দিল, এক্স ম্যানদের ভেতর কিভাবে দলাদলি শুরু হল এসব দেখানো হয়। এখানে তরুণ চালর্স চরিত্রে অভিনয় করেন James McAvoy, ম্যাগনিটো চরিত্রে Michael Fassbender আর মিস্তিক চরিত্রে Jennifer Lawrence. ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিটির পরিচালক ছিলেন Mattew Vaughn. ১৩২ মিনিট দৈর্ঘের এই ছবিটির IMDb রেটিং ৭.৮/১০।

The Wolverine

এক্স ম্যান সিরিজের তৃতীয় মুভি The Last Stand এর পর থেকে এর কাহিনী শুরু হয়। জ্বিনকে নিজ হাতে খুন করে লোগান পাগল প্রায়, কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। একদিন সে জানতে পারে জাপানের একজন মৃত্যুপথযাত্রী সৈনিক (Master Yashida) তাকে একবার শেষবারের মত দেখতে চায় যাকে সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নাগাসিকায় ভয়াবহ নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণে অনিবার্য মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। মৃত্যুপথযাত্রী সৈনিকের শেষ ইচ্ছা পূরণে লোগান বিমানে চেপে বসে, সাথে থাকে তার সর্বক্ষণিক সঙ্গী ইয়্যুকিও (Rila Fukushima). কিন্তু জাপানে পৌঁছেই লোগান এক ভয়ংর ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়। লোগান কি পারবে সেই ষড়যন্ত্রের জাল চিহ্ন করে বেরিয়ে আসতে নাকি এখানেই তার খেল ক্ষতম ? ১২৬ মিনিট দৈর্ঘের এই ছবিটি পরিচালনা করেন জেমস ম্যাঙ্গোল্ড। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটির IMDb রেটিং ৬.৮/১০।

X-Men: Days of Future Past

সম্ভবত এক্স ম্যান সিরিজের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবি এটি। দীর্ঘ বিরতির পর এই ছবির মাধ্যমেই আবার এক্স ম্যান সিরিজে ফিরেন পরিচালক ব্রায়ান সিঙ্গার। এই মুভির প্লটটি ছিল দুর্দান্ত, আগের সবগুলো কাহিনীকেই বদলে দেয় এটি। First Class এর পর থেকে এর কাহিনী শুরু হয়। First Class এর পর ম্যাগনিটো, মিস্তিক আর তাদের সকল সঙ্গীরা ড. টাস্কের হাতে ধরা পড়ে। টাস্ক দীর্ঘদিন ধরে মিউটেন্টদের উপর গবেষণা করছিলেন। সঙ্গীদের করুণ মৃত্যু মিস্তিক মেনে নিতে পারে নি। সে ড. টাস্ককে হত্যা করতে গিয়ে ধরা পড়ে। তার ডিএনএ দিয়ে বানানো হয় ভয়ানক কিলিং মেশিন যা মিউটেন্টদের ভবিষ্যতকে বিপন্ন করে তুলে, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় মিউটেন্টরা। ভবিষ্যতকে বাঁচাতে মিউটেন্টরা সবাই মিলে লোগানকে অতীতে পাঠায়, ৫০ বছর অতীতে। লোগান কি পেরেছিল মিউটেন্টদের বাঁচাতে ? ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া ১৩১ মিনিট দৈর্ঘের এই ছবিটির IMDb রেটিং ৮.২/১০ যা এক্স ম্যান সিরিজের মুভিগুলোর মাঝে সর্বোচ্চ।

২০১৬ সালে এক্স ম্যান সিরিজের অষ্টম মুভি X Men: Apocalypse মুক্তি পাওয়ার কথা আছে। অ্যাডভেঞ্চার, সায়েন্স ফিকশন, অ্যাকশন আর ফ্যান্টাসি সম্বলিত এই অসাধারণ সিরিজটি মিস করে যান নি তো ?

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করছি। পরামর্শ.কম এর অন্যান্য প্রকাশনার আপডেট পেতে যোগ দিন ফেইসবুক, টুইটার, গুগল প্লাসে অথবা নিবন্ধন করুন ইমেইলে।

Leave a Reply