সেবাদানকারী ব্যক্তির নিজের সেবায় করণীয়ঃ পর্ব-৫

responsibilities of care givers

কথায় আছে ’যিনি রাঁধেন তিনি চুলও বাঁধেন’। অর্থাৎ যিনি আরেকজনকে খাওয়াবেন তাকে নিজের যত্ন নিতেও জানতে হবে। তাই আজকে সেবা দানকারী ব্যক্তি নিজের যত্নে কি করবেন সেটি নিয়ে বলব। সেবা দানকারী ব্যক্তির দায়িত্ব ও কর্তব্য পর্বে দেখেছি যে তাকে কাজ এর ব্যবস্থাপনা জানতে হবে। তাকে নিজের যত্নের জন্য তাকে আলাদা সময় রাখতে হবে।

১. প্রতিদিন নিজেকে অনুপ্রেরনা যোগায় এমন কিছু ইতিবাচক আত্ম-সমালোচনা করুন। আমাদের করণীয় ভাল কাজগুলো স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের অনেক উৎসাহ দেয় যেন আরও ভাল কিছু আমরা করতে পারি। আর আমাদের করণীয় অপ্রত্যাশিত মন খারাপ করা আচরণগুলো আমাদের কষ্ট দেয়। যেহেতু যিনি সেবা দান করবেন তাকে সুস্থ মানসিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে তাই তাকে নিজের আচরণের ইতিবাচক দিকগুলোই ভাবতে হবে। আমরা নিশ্চয়ই জানি ইতিবাচক চিন্তা আমাদের জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করে এবং অপরদিকে নিজ আচরণ নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা আমাদের দুর্বল করে দেয়।

২. ঘুম থেকে উঠেই যখন কাজে নামতে হবে তখন খানিকটা সময় হাতে নিয়ে উঠুন যেন নিজের ব্যক্তিগত যত্নের কাজগুলো আগেই সেরে নিতে পারেন। নাস্তা তৈরি বা রোগীর পথ্য দেয়ার আগেই নিজে কিছু খেয়ে নিন। যেন কাজে স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে পারেন।

৩. বয়স্ক মা-খালা বা নানী-দাদীরা অনেক সময়ই গুল বা সাদাপাতা বা পান খেয়ে থাকেন। এই সব তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কারণ এই দ্রব্যগুলো আপনার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ রাখতে কোন ভূমিকা রাখে না। এসবরে পরিবর্তে লেবুর শরবত, গুড়ের শরবত, আচার, বড়ই বা কামরাঙ্গা খান।

৪. মাঝেই মাঝেই গল্প করুন। রোগীর সাথেও মন খুলে গল্প করুন। তবে অবশ্যই রোগীর জন্য অস্বস্তিকর কোন পরিবেশ যেন তৈরি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৫. পরিবারে যখন কাজের বণ্টন করে দিবেন তখন যেন সবাই এ ব্যাপারে সহযোগী মনোভাব রাখতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। যখনই কারো মনে অসন্তোষ তৈরি হবে সেটি নিয়ে তার সাথে আলোচনা করুন। এতে করে নিজের উপরে মানসিক ক্লান্তি বা অতিরিক্ত দায়বদ্ধতার চাপ কমে আসবে।
রাতে ঘুমাতে যাবার পূর্বে কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে পারেন। এটি আরামদায়ক ঘুমের জন্য অনেক উপকারী।

৬. সপ্তাহে বা মাসে যখনই মন চাইবে বাহিরে ঘুরে আসুন। অনেক সেবা দানকারী মনে করেন তিনি যদি বিনোদন করেন তাহলে রোগীর যত্নে অবহেলা হবে বা লোকে তাকে খারাপ ভাববে। কিন্তু যেহেতু আপনি রোগীর সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করছেন। তাই আপনার সুস্থতা অনেক বেশী জরুরী। আর বিনোদন সুস্থ থাকতে সহযোগিতা করে। আপনার নিত্যদিনের খাদ্যাভ্যাস আর বিনোদন আপনাকে অনেক সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখতে সাহায্য করবে।

আসুন পরিবারে ও অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে আমরা যারা সেবা দানকারী রয়েছি তারা যেন নিজের যত্নে যে কাজগুলো করা দরকার তা করতে সচেতন হই। ঝেড়ে ফেলি হীনমন্যতা ও অন্যে কি বলল এই সংকোচগুলোকে। নিজে সুস্থ থাকি ও পরিবারের সুস্থতার জন্য সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের শক্তি অর্জন করি।

এই সিরিজের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ুনঃ

সেবাদানকারী ব্যক্তির দায়িত্বঃ পর্ব-৪

????????????????????????????????????????

আমাদের অসুস্থতার সময়ে যে মানুষটি সবচাইতে বেশি পাশে থাকেন এবং সেবা করেন তিনি আমাদের খুব আপন একজন। আর তার যত্নের জন্য আমরা বেশকিছু নিয়ম জেনেছি আগের পর্বগুলোতে। সেবা দানকারী ব্যক্তির নিজের ও পরিবারের জন্য রয়েছে বিভিন্ন দায়িত্ব ও কর্তব্য। যিনি নিজে সেবা দান করবেন তিনি কাজ এর ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানলে দায়িত্ব সমূহ পালন করা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।

  • পরিবারের এমন কোন ব্যক্তি যিনি অনেক কাজ করে থাকেন তিনি যদি হন সেবা দানকারী তাহলে তার কাজের চাপ থাকবে অনেক বেশী। কাজের দায়িত্ব সমূহের মধ্যে ঘরের অনেক কাজ যেমন বাজার-সদাই, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখাশুনা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের যত্ন ইত্যাদি আরও অনেক কাজ। এর পাশাপাশি তিনিই যখন সেবা দানকারী তখন অতিরিক্ত আরও কাজ তাকে করতে হয়। সে ক্ষেত্রে নিজের পূর্ব পরিকল্পিত কিছু কাজের বণ্টন করে দেয়া যেতে পারে। যেমন বাজারের দায়িত্ব অন্য কোন সদস্য নিলো। এমনভাবে কাজের বণ্টন করলে একজনের উপর থেকে চাপ কিছুটা হলেও কমবে।
  • রোগীকে সেবা দান করার সময় ও খাদ্য সরবরাহের সূচি বা তালিকা মেনে চলা যেতে পারে। এতে করে রোগীর ঔষধ দেয়া বা যত্নে যেমন ঘাটতি পড়বে না তেমনি নির্দিষ্ট সময়ে কাজটি শেষ করা সম্ভব হবে।
  • পরিবারের সদস্যদের কাছে অতিরিক্ত কোন কাজের সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে। যেমন কোন বিশেষ ঔষধ কেনা প্রয়োজন কিংবা ডাক্তার দেখানো কাজ গুলো অন্য কেউ করতে পারে। তবে মনে রাখব নিজে করলে আরও ভাল ভাবে করব কিংবা মানুষ কি বলবে এই ভেবে সব কাজের দায়িত্ব নিজের মাথায় না নেয়াই যুক্তিযুক্ত। কিছু কাজ অন্যদের দিয়েও করিয়ে নেয়া যেতে পারে। এতে করে পরিবারের অন্য সদস্যরাও সেবার কাজে অংশ নিতে পারে এবং পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
  • রোগীর কিছু কাজ রোগীকে নিজে নিজে করতে অভ্যস্ত করা যতটুকু করা রোগীর পক্ষে সম্ভব। অনেকসময়ই আমরা খুব বেশি দায়িত্ব পালনের প্রবণতা থেকে রোগীকে কিছু করতে দিতে চাই না এটা রোগীকে হীনমন্যতায় ভুগাতে পারে। তাই তার করণীয় গুলো নিয়েও তার সাথে আলোচনা করা যেতে পারে এবং অবশ্যই তা করতে হবে অত্যন্ত যত্নসহকারে ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। নতুবা রোগী নিজেকে অবহেলিত ভাবতে পারে।
  • আমরা জানি বিভিন্ন উৎসবের সময়ে কাজের চাপ আরও বেড়ে যায় তাই আতঙ্কিত না হয়ে পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে। উৎসবের দিনগুলো রোগীর খাবার তালিকা কি হবে, কি কি কাজ করতে পারবে তার আগে থেকেই আলোচনার মাধ্যমে তালিকা তৈরি করা। এসময় পরিবারের সদস্যরাও সহযোগিতা করতে পারে।
  • পারিবারিক অর্থ বণ্টন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সময়ে আলাদা একটা বাজেট রাখা যেতে পারে যেন অতিরিক্ত ঔষধ বা সেবার খরচটা সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হয়। অনেক পরিবারেই আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় অনেক বেশী টাকা খরচ হয়ে যায়। তখন প্রয়োজনের টাকা যোগান দিতে হিমশিম থেতে হয়। তাই এটিও সেবা দানকারী ও পরিবারের সদস্যরা মিলে ঠিক করতে পারে।

আমাদের পরিবারের প্রত্যেকের সহযোগিতার মাধ্যমেই একজন অন্যজনের পাশে থাকতে পারি। সুস্থ শরীর এর পাশাপাশি সুস্থ পারিবারিক বন্ধন গড়তেও সেবা দানকারী ব্যক্তির দায়িত্ব বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ।

এই সিরিজের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ুনঃ

সেবাদানকারীর যত্নে প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাব্য সমাধানঃ পর্ব-৩

আমরা আগের পর্বেই দেখেছি যে শুনতে যতটা সহজ লাগছে যে সেবা দানকারীর যত্ন কিন্তু কাজটি অত সহজ নয়। এখানে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। কারণ আমরা জানি একটি পরিবারে নানা রকম মতের মানুষের বসবাস এবং দৃষ্টিভঙ্গিও এক এক জনের একেক রকম। আবার তথ্য জানা থাকার ব্যাপারেও কেউ একটু কম জানেন তো কেউ বেশি। তাই মতের অমিল তো হবেই।

আজকে আমরা খুঁজে দেখব একজন সেবা দানকারী ব্যক্তিকে যত্ন নিতে গিয়ে কি কি প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে এবং এর সম্ভাব্য সমাধান কি হতে পারে।

• যদি সেবা দানকারীর পরিবারে মতামত প্রকাশের জায়গা না থাকে- সেই ক্ষেত্রে তিনি চুপচাপ সেবা দিয়েই যান। তার নিজের জন্য তিনি কোন জায়গা দেখতে পান না এবং মনের দিক থেকে নিজেকে ছোট ভাবতে থাকেন। অনেকসময় হতাশাগ্রস্ত হয়ে অনেকেই মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। এসময় আমরা যারা আশেপাশে আছি তারা সচেতন হয়ে তাকে মতামত প্রকাশের জায়গা করে দিতে হবে। যখন তিনি মতামত দিবেন হতে পারে সেটি সর্বসম্মত নয়। তবু তার যে বলবার ও মত প্রকাশে অধিকার রয়েছে এই ভাবনাটিও তাকে মানসিক ভাবে এগিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।

• সেবা দানকারী নিজেই যখন নিজের যত্নের ব্যাপারে উদাসীন- ব্যক্তি নিজেই যখন কোন রকম যত্নের প্রয়োজন নেই মনে করেন তখন এটি অনেক কঠিন হয়ে পরে যে তাহলে তার যত্ন নেয়ার পদ্ধতিটি কি হতে পারে। তখন আশেপাশের অন্যান্য সদস্যদের ধৈর্য সহকারে তার পাশে থাকতে হবে। এবং পুরো তথ্য সঠিক ভাবে তাকে জানাতে হবে যে কেন একজন সেবা দানকারীর সেবা প্রয়োজন। যখন পুরো সঠিক তথ্য তাকে দেয়া হবে তখন তিনি নিজেই কিছু কিছু করে যত্নের ব্যাপারে সচেতন হতে পারবেন।

• পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ যখন বাঁধা তৈরি করে- এমনটা ঘটতে পারে যে শ্বশুর-শাশুড়ি বা বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ সেবা দানকারী ব্যক্তিটির যে সেবার বা যত্নের প্রয়োজন সেটি মানতেই নারাজ। কিংবা তার জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ থাকলে এতে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটি বিরক্ত হন। তখন আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সামনে এনে পরিষ্কার করে নেয়া প্রয়োজন। পরিবারে কোন বিষয় না লুকিয়ে অপরের প্রতি সম্মান ও নিজ মনোবল বজায় রেখেই সেবা দানকারী ব্যক্তিটির প্রয়োজন ও চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। এবং আলোচনার মাধ্যমে তার যত্নের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করে দিতে হবে। কারণ যিনি বাঁধা তৈরি করছেন তিনি হয়ত একদৃষ্টিতে বিষয়টিকে দেখতে পারেন। তাই তার সাথে বিতণ্ডায় না জড়িয়ে অন্য দিক থেকেও যে এই ব্যাপারটি দেখা যায় সেটি বুঝতে ও দেখতে সহযোগিতা করতে হবে।

• সেবা দানকারী ব্যক্তির শারীরিক অক্ষমতা- অনেকসময় অতিরিক্ত কাজের চাপে তার শারীরিক ঘাটতি বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তখন তাৎক্ষণিক তার যত্নের জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। এবং তিনি যেহেতু পরিবারে আরও অন্য কারো সেবা করছেন সুতরাং তাকেও নিয়মিত নিজের শরীরের চেকআপ করানো বা ওজন মাপা, খাদ্য তালিকায় পুষ্টিকর খাদ্য সংযোজন ইত্যাদি করতে সহযোগিতা করতে হবে।

• যখন সেবা প্রাপক ব্যক্তিটির সংক্রামক কোন ব্যাধি থাকে- এ সময় সেবা দানকারী ব্যক্তিটি সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাই তার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা রাখা জরুরি হয়ে পরে। এসময় সেবা দানকারী ব্যক্তি অসুস্থতাকে গ্রহণ করে নেয়ার মানসিক প্রস্তুতি রেখে থাকে। তাই নিজের জন্য সেবা বা ঔষধ ব্যবহারে অনীহা দেখাতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবারের অন্যান্য ব্যক্তি ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সহযোগিতায় তাকে সেবা গ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। একই সাথে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব করা ঔষধ সেবন ও বাড়তি যত্ন নিতে হবে।
সেবা দানকারী ব্যক্তির যত্ন নিয়ে জাতীয় উন্নয়নে মানব সম্পদ রক্ষায় আমরা ভূমিকা রাখতে পারি।

এই সিরিজের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ুনঃ

সেবাদানকারীর যত্ন কিভাবে নেবেনঃ পর্ব-২

take care of nursesগত পর্বে আমরা জেনেছি সেবা দানকারী ব্যক্তিটি কে এবং তার যত্নের কেন প্রয়োজন। আজকে এরই ধারাবাহিকতায় জানব যিনি নিজেই সেবা দান করছেন তার যত্নের জন্য বা সেবার জন্য আমাদের করণীয় কি এবং তা কিভাবে করব।

আমাদের সমাজের একটা প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে কোন ব্যক্তি যদি নিজের অধিকার বা প্রয়োজনটুকু চিন্তা করে তাহলে সে স্বার্থপরতা দেখাচ্ছে, শুধুমাত্র আরেকজনের জন্য ভাবতে হবে নিজের জন্য ভাবা ঠিক না ইত্যাদি ইত্যাদি। এ কারণে আমাদের পরিবারের যিনি সেবা দানকারী হয়ে থাকেন তিনি বেশিরভাগ সময়ই কিন্তু নিঃস্বার্থ মনোভাব বজায় রাখতে আরেকজনের জন্য নিবেদিত প্রাণ হন। সে কারণে সেবার বিষয়টি তিনি শুধু দিয়ে যাবেন কিন্তু নিতে পারবেন না এমনটাই বদ্ধমূল হয়ে থাকে।

আর এ কারণেই আপনি যখন সেবা দানকারীর যত্ন নেয়ার কথা বলবেন বা করতে যাবেন সেটি পরিবারের অন্যরা হয়ত ভাল ভাবে নাও নিতে পারে কিংবা সেবা দানকারী ব্যক্তিটি নিজেও হেসে উড়িয়ে দিতে পারে বা সংকোচ করতে পারে। তাই এই বিষয়টি যত সহজ মনে হচ্ছে অতটা সহজ নয়। একজন সেবা দানকারী ব্যক্তির যত্নে তাই আশেপাশের মানুষকে সচেতন হতে হবে। আসুন জেনে নেই সচেতন হয়ে আমরা কি করতে পারি।

  • সেবা দানকারী ব্যক্তিটিকে মাঝে মাঝেই ছুটি দিতে পারেন। তার অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে তাকে কিছুটা অব্যাহতি দিয়ে ঘুরতে যেতে বলতে পারেন। কিংবা বিশ্রাম নেয়ার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করে দিন। যেন তার নিজেকে দেয়ার মত সময়টা তিনি পান।
  • অসুস্থ যে ব্যক্তির সেবায় তিনি নিয়োজিত আছেন সেই ব্যক্তির সাথে রক্তের বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়ে থাকলে ঐ ব্যক্তির অসুস্থতা নিয়ে তার মনেও অনেক হতাশা, কষ্ট রয়েছে। তাই তার সেই না বলা কথা গুলো শুনতে হবে মনোযোগ দিয়ে।
  • অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে তার শরীরে যে পুষ্টির ঘাটতি হচ্ছে তা সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিকর খাদ্যের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • সেবা দানকারী ব্যক্তির স্বাভাবিক চাহিদা ব্যাহত হচ্ছে কিনা দেখতে হবে। যদি অসুস্থ ব্যক্তির সাথে তার এমন কোন বিষয় জড়িত থাকে যা সে মেটাতে পারছে না তাহলে সেটি কিভাবে সে অন্য কোন উপায়ে সমাধান করতে পারে বা মানিয়ে নিতে পারে সেটিও পরামর্শ বা সহযোগিতা করতে হবে।
  • অসুস্থ ব্যক্তির যদি কোন সংক্রামক রোগ থাকে তাহলে অবশ্যই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে অনেক সেবা দানকারী ব্যক্তিও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকেন। তাই একে সহযোগী বিবেচনায় এনে তাকেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতন রাখতে সহযোগিতা করতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা অনেক সংকোচ করি কারণ মনে করি যে অসুস্থ ব্যক্তিটি এত আপন অথচ তার অসুখে নিজেকে এত সচেতন রাখতে হবে কেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে ব্যক্তিটি আপনার আপন কিন্তু রোগটি নয়। সুতরাং অবশ্যই রোগীর প্রতি সম্পর্কের সবটুকু সম্মান বজায় রেখে আমাদের রোগ ও ব্যাধিগুলো নিয়ে সচেতন হতে হবে।
  • একটি পরিবারে কেউ অসুস্থ হয়ে থাকলে এর প্রভাব পুরো পরিবারেই পরে থাকে। তাই শুধুমাত্র সেবা দানকারী ব্যক্তিটিই নয় পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও নিজেদের প্রতি যত্নবান হতে হবে।

পরিবারে বসবাসকারী প্রতিটি ব্যক্তিই একে অন্যের অনেক বেশী আপন। আর তাই আপন মানুষটিকে যিনি সেবা দিচ্ছেন তার সুস্থতাও নিশ্চিত করা আমাদেরই দায়িত্ব। আসুন নিজের যত্ন নেই এবং সেবা দানকারীকেও যত্ন নিতে শিখি।

এই পর্বের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ুনঃ

 

সেবাদানকারীর সেবা করবেন যেভাবেঃ পর্ব-১

how to take care of nurses

আমরা যখন মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে অসুস্থ হই তখন এমন একজন মানুষ আমাদের পাশে থাকেন যিনি আমাদের যত্ন নেন, সেবা বা শুশ্রূষা করেন। আবার আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে বা জীবন-যাপন সহজতর করতে সেবা দানকারী ব্যক্তিটির অবদান অপরিসীম। আর তাই সেবা দানকারী ব্যক্তিটির সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরী। আসুন পর্যায়ক্রমিকভাবে জেনে নেই সেবা দানকারী সম্পর্কে বিস্তারিত।

একজন সেবা দানকারী ব্যক্তি যে কেউ হতে পারেন। তবে সাধারণত পরিবারের কোন এক বা একাধিক মানুষ যেমন মা অথবা বাবা অথবা ভাই বা বোন এই সেবা দান করে থাকেন। অনেকসময় বয়োজ্যেষ্ঠ নিকটাত্মীয় এই ভূমিকা পালন করে থাকেন যেমন খালা, ফুপু, মামী ইত্যাদি।

আজকে আমরা জানব কি কি কারণে সেবা দানকারী ব্যক্তির সেবা (care) প্রয়োজন।

  • সেবা দানকারী ব্যক্তি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তার সুস্থ থাকাটা আরও অনেক বেশী জরুরি।
  • একজন অসুস্থ ব্যক্তির দিকে মনোযোগ বেশী থাকার কারণে অনেক সময় আমরা সেবা দানকারী ব্যক্তিটির প্রয়োজন বা সমস্যা মেটানোর জন্য তাকে সময় দেয়ার কথা ভুলে যাই। এতে করে সামান্য যত্নের অভাবে বড় কোন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এই ব্যক্তিটিরও সেবা ও যত্নের প্রয়োজন।
  • কোন পরিবারে সেবা দানকারী ব্যক্তিটি যদি অবহেলিত হন তাহলে তার আত্ম মর্যাদাবোধ ও আত্মতুষ্টি কমে যায়। সে সামাজিকভাবে মিশতে চায় না। এতে করে পরিবারে অশান্তি দেখা দিতে পারে।
  • আমরা মনোযোগ দিলেই দেখব সেবা দানকারী ব্যক্তিটি শুধুমাত্র সেবা দিচ্ছে তা নয়। পরিবারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজও কিন্তু তাকে করতে হচ্ছে। যদি ব্যক্তিটি মা হন তাহলে সেবা দানের পাশাপাশি তাকে ঘরের সব কাজই করতে হয়। একারণে তারও যত্নের প্রয়োজন যেন অন্যান্য কাজেও তিনি সাবলীলভাবে ভারসাম্য রাখতে পারেন। আবার যদি ব্যক্তিটি বাবা হন তাহলে তিনি তার কাজ ও সেবা প্রদান দুটিই গুরুত্ব দিয়ে করে থাকেন বিধায় তাকেও যত্নের আওতায় থাকতে হবে।
  • সেবা দানকারী ব্যক্তি যদি নিকটাত্মীয় কেউ হয়ে থাকেন তাহলে তার নিজ পরিবারের জন্যেও তার দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে। আর তখন যদি ব্যক্তিটির মনোযোগ বা যত্নের ঘাটতি হয় সেটি তার জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে যাবে তাই অবশ্যই সেবা দানকারী ব্যক্তির যত্নের প্রয়োজন।

আমরা নিজের যত্নের কথা ঠিক যেভাবে ভাবি তেমনি সেবা দানকারী ব্যক্তিটির জন্যেও ভাবতে হবে। পরবর্তী পর্বে আমরা দেখব কিভাবে সেবা দানকারী ব্যক্তির যত্ন নিব।

এই সিরিজের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ুনঃ

নিয়ন্ত্রণ করুন নিজের রাগ ও এর বহিঃপ্রকাশের ধরণ

coltrol anger

আমাদের অন্যান্য অনুভূতিগুলোর মতই রাগ অনেক স্বাভাবিক এবং শক্তিশালী একটি অনুভূতি। তবে অতিরিক্ত রাগ ও এর অনিয়ন্ত্রিত বহিঃপ্রকাশ নিজের জন্যে এবং অন্যজনের জন্যেও ক্ষতিকর। রাগ হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের মধ্যে কিছু শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তন হয়ে থাকে। আমরা যদি জানতে পারি আমাদের পরিবর্তনগুলো কিভাবে হচ্ছে এবং ক্ষতিকর দিকগুলো কি তাহলে সহজ হয়ে যাবে জীবন-যাপনের জটিলতা।

রাগে একজন ব্যক্তির শারীরিক পরিবর্তনঃ

  • ঘাম হয়, শরীর কাঁপতে থাকে
  • হৃৎপিণ্ডে দ্রুত রক্ত চলাচল ঘটে
  • মাথা ভার হয়ে যায়
  • দ্রুত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ঘটে
  • অতিরিক্ত রাগে কখনও কখনও হার্ট-এট্যাক, ব্রেইন-স্ট্রোক হতে পারে।

রাগে ব্যক্তির মানসিক পরিবর্তনঃ

  • নিজের ও অন্যদের উপর বিরক্তি তৈরি হয়
  • সম্পর্ক ও বিশ্বাস বিনষ্ট হয়
  • আত্ম-সম্মানবোধ কমে যায়
  • আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হয়

রাগে ব্যক্তির আচরণগত পরিবর্তনঃ

  • আক্রমণাত্মক অঙ্গভঙ্গি প্রকাশ পায়( যেমন- আঙ্গুল তুলে কথা বলা, আঘাত করা)
  • কণ্ঠস্বর তীব্র ও কর্কশ হয়ে যায়
  • কাজ-কর্মে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হয়
  • নিজেকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে ( হাত কাটা, মাদক গ্রহণ, আত্মহত্যা)
  • অন্যদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে (মারধোর করা, ভয় ভীতি দেখানো, ত্রাস সৃষ্টি করা)
  • ভাংচুর করে পরিবেশ নষ্ট করে
  • আইন নিজের হাতে তুলে নেয়

এমনটা হলে আমাদের জানতে হবে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো অভ্যন্তরীণ ভাবে হতে থাকে। এবং আচরণগত পরিবর্তনটা আমরা নিজেরা করে থাকি। তাই রাগ প্রকাশ করার আচরণ কি হবে সেটা আমাদের নিজেদের নির্ধারণ করতে হবে। এখানে সংক্ষিপ্ত কিছু কৌশল দেয়া হল এর বাইরেও অনেক কৌশল রয়েছে যা ব্যক্তিকে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে থাকে।

রাগ বহিঃপ্রকাশে আচরণ নিয়ন্ত্রণের কৌশলঃ

    ১. নিজের রাগ কখন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে হচ্ছে সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা রাখা।

    ২. রাগ এর পরিমাণ সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। যখন রাগ করছি তখন কতটা রেগে যাচ্ছি সেটাকে একটা নম্বর দেয়া।

    ৩. রাগ হওয়ার সময় সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া না করে কিছুক্ষণ বিরতি নেয়া। ২ থেকে ৩ মিনিট সময় নেয়া যেতে পারে। কিংবা রাগের মাত্রার উপর নির্ভর করে আরও সময় বাড়ানো কমানো যায়। আমি কিভাবে রাগ প্রকাশ করছি এবং এতে আশেপাশে কেউ বা নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি কিনা বিশ্লেষণ করা। যদি এমন আচরণ শনাক্ত করা যায় তাহলে এর পরিবর্তে অন্য কোন আচরণটা যুক্তিসঙ্গত ভাবে আমার রাগ প্রকাশ করবে এবং অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না সেটা বাছাই করা। ( যেমন কেউ কেউ ঐ স্থান থেকে সরে গিয়ে নিরিবিলি বসে থাকে, অন্য কোন কাজে মনোযোগ দেয়, পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলে, রাগ হওয়ার কারণটা স্পষ্ট করে বলে ইত্যাদি)।

    ৪. নিজে থেকেই রাগের মুহূর্তের বাছাইকৃত আচরণটাকে অনুশীলন করা এবং স্বেচ্ছায় পরিবর্তিত আচরণটা করার প্রত্যয় গ্রহণ করা।

    ৫. যখন কোন ক্ষেত্রে দেখলেন পরিবর্তিত আচরণ করতে পেরেছেন তখন নিজেকে মনে মনে প্রশংসা করা।

রাগের মুহূর্তে অন্যদের কিছু কাজ আমাদের আরও রাগিয়ে দেয়। সে সময়ে মনে রাখতে হবে, রাগ যেহেতু স্বাভাবিক অনুভূতি তাই একজন মানুষ হিসেবে আমরা তো রাগ করবই। কিন্তু রাগ প্রকাশ করার আচরণ এর উপর আমাদের নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সুতরাং আমরা একটু সচেতন হলেই এই আচরণ ইতিবাচক ভাবে বদলে ফেলতে পারি।

এ ধরণের আরও লেখা পড়ুনঃ